সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা সম্পর্ক, বিয়ের প্রতিশ্রুতি এবং সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার উদ্ভব হয়েছে। মালয়েশিয়া প্রবাসী মাহফুজ আলম (৩৭) অভিযোগ করেছেন, ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে জান্নাতুল বুশরা (৩১) নামের এক নারী তার কাছ থেকে প্রায় ৯ লাখ টাকা প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন।
ভুক্তভোগীর দেওয়া অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ সালে মালয়েশিয়ায় অবস্থানকালে ফেসবুকের মাধ্যমে বুশরার সঙ্গে পরিচয় হয় মাহফুজ আলমের। প্রাথমিক কথোপকথন থেকে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। একপর্যায়ে বুশরা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং ভবিষ্যতে সংসার গড়ার নানা আশ্বাস দিতে থাকেন।
প্রবাস জীবনের একাকীত্ব ও আবেগঘন সম্পর্কের কারণে মাহফুজ আলম সেই প্রস্তাবে রাজি হন। এরপর নিয়মিত ফোন ও অনলাইনে যোগাযোগ চলতে থাকে। কিছুদিন পর থেকেই বুশরা নিজের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা তুলে ধরে আর্থিক সহায়তা চাইতে শুরু করেন।
অভিযোগে বলা হয়, কখনও পড়াশোনার খরচ, কখনও অসুস্থতার চিকিৎসা, আবার কখনও জরুরি পারিবারিক প্রয়োজনের কথা বলে ধাপে ধাপে টাকা দাবি করা হয়। বিয়ের প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে এসব অর্থ নেওয়া হয় বলে দাবি ভুক্তভোগীর।
মাহফুজ আলম জানান, তিনি ইসলামী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর এবং বুশরার ব্যবহৃত বিকাশ ও নগদ নম্বরে বিভিন্ন সময়ে টাকা পাঠান। সব মিলিয়ে তার পাঠানো অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ লাখ টাকা।
এই ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভুক্তভোগীর কাছে টাকা পাঠানোর সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তিনি ব্যাংক লেনদেনের রসিদ, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ট্রানজেকশন হিস্ট্রি এবং কথোপকথনের স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করেছেন, যা তিনি পুলিশের কাছেও জমা দিয়েছেন।
মাহফুজ আলম দাবি করেন, আমি প্রতিটি টাকা পাঠানোর প্রমাণ পুলিশের কাছে দিয়েছি। ব্যাংকের কাগজপত্র, বিকাশ-নগদের ট্রানজেকশন সব কিছুই আছে। এটা পরিকল্পিত প্রতারণা, আমি এর সঠিক বিচার চাই।
অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থ লেনদেনের সময় বুশরার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তার কথা হয়েছে। তারা বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করায় তার সন্দেহ আরও কমে যায় এবং তিনি পুরো বিষয়টিকে একটি বৈধ সম্পর্ক হিসেবেই মনে করেন।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি দেশে ফিরে এসে তিনি সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু তখন থেকেই বুশরা এবং তার পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ এড়িয়ে যেতে থাকেন বলে অভিযোগ।
পরবর্তীতে ৬ এপ্রিল সকালে তিনি রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালী এলাকায় বুশরার বর্তমান ঠিকানায় যান। সেখানে গিয়ে তাকে না পেয়ে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নেন এবং তার নানার বাড়িতে যান। তবে সেখান থেকেও তিনি কোনো স্পষ্ট তথ্য পাননি।
একইদিন দুপুরে গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের মাহনা এলাকায় বুশরার স্থায়ী বাড়িতে গেলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার কথা হয়। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বুশরার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা কোনো সদুত্তর দেননি। বরং বিয়ের প্রসঙ্গ তুললে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং ভুক্তভোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।
মাহফুজ আলমের অভিযোগ, একপর্যায়ে তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। তিনি মনে করেন, এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণা, যেখানে বুশরা তার পিতা, মাতা ও ভাইদের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে তাকে ফাঁদে ফেলেছেন।
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম সালাউদ্দিন বলেন, ভুক্তভোগীর অভিযোগটি আমরা গ্রহণ করেছি এবং তিনি যে লেনদেনের প্রমাণাদি দিয়েছেন, সেগুলো আমরা যাচাই করছি। ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ব্যাংকিং এবং যোগাযোগের তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে বিষয়টি প্রতারণার অভিযোগ হিসেবে তদন্তাধীন রয়েছে।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে এই ধরনের প্রতারণা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের টার্গেট করে আবেগঘন সম্পর্ক গড়ে তুলে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা নতুন নয়, তবে এর পরিধি বাড়ছে।
ভুক্তভোগী মাহফুজ আলম তার কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তার আশা, প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

